Breaking News
recent

আদালতে জুনিয়র আইনজীবীদের দুঃখ-গাঁথা

4ncEGA4TA
বাংলাদেশে যতগুলো আত্মনির্ভরকেন্দ্রিক পেশা রয়েছে তার মধ্যে আইন পেশা হল সবার পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এ পেশায় এসে আপনি যেমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন, তেমনি সমাজে সবার কাছে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন। একটা সময় ছিল যখন আইন পেশা শুধুমাত্র সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর পেশা ছিল। কালের বিবর্তনে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও এই সম্মানি পেশায় এসেছেন, পরিবর্তন হয়েছে সময়, বদলে গেছে অনেক কিছুই শুধু বদলায়নি আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আসা সম্ভাবনাময় তরুণ আইনজীবীদের ভাগ্য। কেননা বেশিরভাগ সময়ে আইন পেশায় ভাগ্য গড়তে আসা তরুণ আইনজীবীদের সিনিয়রদের কাছে চাওয়াগুলো পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যেন তাদের সুখ-দুঃখ দেখার কেউ নেই।
আইন বিভাগে সম্মান কিংবা স্নাতকোত্তর পাশ করার পর সদ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরনো তরুণ আইনজীবীরা খুঁজে ফেরেন নিজস্ব সুবিধা মত কোন সিনিয়র আইনজীবী। কোন সিনিয়র আইনজীবীর সাথে নিজেকে সংযুক্ত করেন। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি বাস্তবিক জীবনে আইন পেশার অনুশীলন (প্র্যাকটিস) করার খুঁটিনাটি সকল বিষয়ে অবগত হওয়ার লক্ষ্যে। আইন পেশায় আসতে এটাই প্রথম ধাপ এবং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ যা সবার কাছে জুনিয়রশিপ বলে পরিচিত। জুনিয়রশিপ করতে আসা তরুণ আইনজীবীরা সিনিয়রদের সীমাহীন বঞ্চনা, আন্তরিকতাহীন অকথ্য ব্যবহারে হতাশায় হাঁপিয়ে উঠেন। জুনিয়রশিপ উপেক্ষা করে আইন পেশায় ভালো ক্যারিয়ার গড়া কষ্টসাধ্য বলে বিরক্তি আর শত বঞ্চনাসহ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যান অনেক কিছুই।
ঢাকা বার এশিয়ার বৃহত্তম আইনজীবী সমিতি। যেখানে বর্তমানে সনদপ্রাপ্ত আইনজীবীর সংখ্যা বিশ হাজারের কাছাকাছি। আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে তরুণ আইনজীবীদের সবচেয়ে আরাধ্য ঢাকা বার। যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সদ্য পাশ করা তরুণ আইনজীবীরা অনেক আসা নিয়ে আসেন, আইনের বাস্তবিক অনুশীলনের খুঁটিনাটি বিষয়ে বিশদভাবে জানতে। কিন্তু নিয়তি তাদের এতই নির্মম যে সিনিয়রদের কাছে আইনের বিষয়ে শিখতে এসে নিয়মিতভাবে অপ্রত্যাশিত দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। সিনিয়ররা সহযোগিতার বদলে পিয়নের মত পরিশ্রম করান বলেও অভিযোগ জুনিয়রশিপ করতে আসা অনেক তরুণ আইনজীবীর। এত পরিশ্রমের পরও কখনো কখনো ঠিকভাবে প্রত্যাশিত পারিশ্রমিকটাও পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বারে জুনিয়রশিপ করছেন এমন অনেক আইনজীবীর সাথে কথা বলে জানা যায়, আইনের বাস্তবিক অনুশীলনের খুঁটিনাটি বিষয়ে শেখাতেও সিনিয়রদের ব্যাপক অনীহা রয়েছে। কেন সিনিয়রদের এমন আচরণ সে বিষয়ে জানতে চাইলে তরুণ আইনজীবীরা জানান ‘ভয়ে’। পাল্টা প্রশ্নে কিসের ভয় জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জুনিয়রশিপ করছেন এমন একজন আইনজীবী ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম’কে বলেন, ‘ আরে বুঝেন না, আমরা যদি সব কিছু তাড়াতাড়ি শিখে যাই তাহলে তো উনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারি এই ভয়।’
পাশে থাকা অপর একজন তরুণ আইনজীবী সহমত পোষণ করে ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম’কে বলেন, ক্লায়েন্ট যদি বুঝে যায় যে সিনিয়র আইনজীবী যা জানেন তার জুনিয়রও সমপরিমাণ জ্ঞানসম্পন্ন তাহলে বেশি টাকা দিয়ে ক্লায়েন্টরা তো আর সিনিয়রদের কাছে যাবেন না। কম টাকায় একই সেবা জুনিয়রদের থেকে পেয়ে যাবে এই আশঙ্কায় ভুগেন আমাদের সিনিয়ররা। তাই আমাদেরকে সবকিছু শেখাতে চান না।’
পারিশ্রমিক কেমন পায় জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘এটা আসলে ব্যক্তিভেদে ভ্যারি করে, তবে সাধারণত দুইশ থেকে চারশ কিংবা বড়জোর পাঁচশ, কেউ কেউ একশ টাকাও দেন।’ স্নাতক পাশের পর একশ টাকা দৈনিক আয় সেই লজ্জা ঢাকতে হেসে উঠেন এই আইনজীবী।
স্নাতক পাশের পর আমাদের দেশের অন্য পেশায় এত কম বেতন বোধহয় আর কোথাও নেই। তাছাড়া স্নাতক পাশের পর পরিবার থেকেও সন্তানের প্রতি চাওয়া-পাওয়ার হিসেবের খাতা খোলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিরুপায় বাবা-মা। সেদিক থেকে পরিবারের চাহিদা মেটানো দূরের কথা নিজের ব্যক্তিগত কিংবা ঢাকায় অবস্থানের পুরো টাকা জোগাড়ে ব্যর্থ হতভাগা জুনিয়রশিপরত তরুণ আইনজীবীরা। সময় পাল্টে গেছে, বদলে গেছে অনেক কিছু। কিন্তু সিনিয়রদের অবিরাম অবহেলায় এই পেশাটি অতীতের মত আজো শুধু উচ্চবিত্তদের জন্য পথ সুগম করেছে।
এ ব্যাপারে সিনিয়রদের কাছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন আইনজীবী ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম’কে বলেন, ‘ আইন পেশায় ধৈর্য্য ধরতে হবে, কষ্ট করতেই হবে, আমরাও আমাদের সিনিয়রদের বকাঝকা শুনেই শিখেছি।’
এই সমস্যা দূর করতে কি করণীয় জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান না হলে এই পেশায় আসা উচিৎ না।’ এছাড়া আর কোন সমাধান নেই বলেও তারা জানান।
অপর দিকে জুনিয়রশিপরত তরুণ আইনজীবীরা এই সমস্যা নিরসনে কি করণীয় তার পরামর্শ চাইলে তারা বলেন, সিনিয়রদের আন্তরিক হতে হবে, কাজটা ঠিকমত শেখাতে অনীহা থাকার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে, ভুল হলে বকাঝকা করলেও অন্য সময়ে ব্যবহারটা ভালো করতে হবে, আর পারিশ্রমিকটা বাড়িয়ে দিলে কাজে আগ্রহ বাড়ে।’ এছাড়াও তারা দাবি জানান ঢাকা আইনজীবী সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি এই বিষয়গুলোর দিকে সুনজর দিয়ে তদারকি করেন অথবা আইনসিদ্ধ কোন নিয়ম বা নীতিমালা প্রণয়ন করেন তবে আমাদের দেশে আইনপেশা শুধুমাত্র উচ্চবিত্তদের পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ভবিষ্যতে মধ্যবিত্তরাও এ পেশায় এসে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন এবং সমাজে সবার কাছে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন।
আদালত প্রাঙ্গন থেকে ঘুরে এসে রিপোর্ট করেছেন কাজি ফয়েজুর রহমান ও মোঃ সাজেদুল হক
-ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম।
MD. Rasel Rana

MD. Rasel Rana

Blogger দ্বারা পরিচালিত.